মেনু নির্বাচন করুন

মার্চ ১৯৭১, পটভূমি, স্বাধীনতার ঘোষণা ও মহাসংগ্রাম গাথা।

প্রথমেই একটি গল্প বলতে চাই। যে ক্রিকেট আজ আমাদের রক্তের প্রতিটি কণায় অনুভুত হয় সেই ক্রিকেট নিয়ে। ১৯৭১, ২৬শে ফেব্রুয়ারি। ঢাকায় শুরু হয়েছিলো পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড একাদশ ও আন্তর্জাতিক একাদশের মধ্যে চারদিনের একটি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ। সে ম্যাচে ওপেনার ছিলেন পাকিস্তানের হয়ে খেলা একমাত্র বাঙালী ক্রিকেটার রকিবুল হাসান। টেস্ট ক্রিকেট তাকে হাতছানি দিচ্ছিলো অনেকদিন ধরেই এবং সব ঠিকঠাক থাকলে জাতীয় দলের প্রথম একাদশে সুযোপ পাওয়াটা ছিলো সময়ের ব্যাপার মাত্র। হয়তো আসন্ন ইংল্যান্ড সফরেই জুটে যেত। নিজেকে আলাদাভাবে চিনিয়েছিলেন রকিবুল অন্যভাবে। গানস অ্যান্ড মুর ব্যাটে জয় বাংলা লেখা ও স্বাধীন বাংলার মানচিত্র আঁকা স্টিকার নিয়ে খেলতে নেমেছিলেন আঠারোর ওই উদীপ্ত তরুণ। বন্ধু শেখ কামালের মাধ্যমে স্টিকার জোগাড় করে লাগিয়েছিলেন ব্যাটে। এর মূল্যও দিতে হয়েছে তাকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে।

রকিবুলের খেলা সেই ম্যাচ চতুর্থ দিনে গড়ালো, ১ মার্চ। দুপুরে রেডিওতে ভেসে এলো ইয়াহিয়ার ঘোষণা, “৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।" মুহূর্তে গোটা স্টেডিয়াম প্রকম্পিত হলো জয় বাংলা শ্লোগানে। হাতে থাকা পত্রিকা দিয়ে আগুন জ্বালানো হলো গ্যালারিতে। পুড়লো পাকিস্তানের পতাকা। ম্যাচ পরিত্যক্ত। মাঠে থাকা সামরিক-আধাসামরিক বাহিনীর বন্দুকগুলো তাক হলো বিদ্রোহের শ্লোগান ধরা বাঙালীদের দিকে। ঠেকানো গেলো না। অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম প্রতিবাদ এবং অনিবার্য যুদ্ধের চূড়ান্ত গতি নির্ধারণ করে দেওয়া আন্দোলনের প্রথম স্রোতটা জন্ম নিলো ওই ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে।


একাত্তর আমার ভালবাসা। সেই আবেগ থেকেই আজ কলম হাতে একটি প্রচেষ্টা, যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় মার্চ মাস। ২৫শে মার্চের কাল রাত্রি বা ২৬ এর স্বাধীনতা দিবসের সামনে দাঁড়িয়ে এখন, এই ক্ষণ আবেগে যেমন রুদ্ধ করেছে তেমনি শক্তিতে করেছে বলীয়ান।

বছর ঘুরে এ মাস আসতেই বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১-এর মার্চ মাসে ফিরে যায়। যত দিন বাংলাদেশ পৃথিবীতে টিকে থাকবে, তত দিন মার্চ মাসের অর্থবহতা বাঙালির চেতনায় রবে উজ্জ্বল। পাকিস্তানি শোষক গোষ্ঠীকে চূড়ান্ত বর্জনে পদদলিত করার প্রত্যয় নিয়ে স্বাধিকার আন্দলনের চূড়ান্ত বীজটি যে কোটি প্রানে বপিত হয় এই মহান মাসেই।


মার্চ যেন এক মহাকাব্যের নাম। একটি পোস্টে হয়ত লিখে শেষ করতে পারবো না। চেষ্টাটি তবুও করেছি, আপনাদের জন্যেই।



৭ই মার্চ এবং এর পটভূমিঃ ]

১লা মার্চ ১৯৭১: পাকিস্তানের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবেই একটি ঘোষণা করেন। তা হল, পরবর্তী তারিখ ঘোষণা না করা পর্যন্ত, ৩রা মার্চের জাতীয় পরিষদের পূর্বনির্ধারিত অধিবেশনটি স্থগিত করা হলো। স্থগিতাদেশ দাবিটি ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই করেছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। সেই সময় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন সফল করতে হোটেল পূর্বাণীতে পাকিস্তানের সংবিধানের খসড়া তৈরিতে নেতৃবৃন্দ ব্যস্ত ছিলেন। সেই মুহূর্তে অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব ছিল। বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ওই দিন দুপুরে খবর শোনার সঙ্গেসঙ্গে রাস্তায় প্রতিবাদ করতে করতে নেমে আসে। বঙ্গবন্ধু ওই সময় হোটেল পূর্বাণীতে অবস্থান করছিলেন, জনগণ তাঁর কাছেই ছুটে গেল। বঙ্গবন্ধু সমবেত হাজারো জনতার সম্মুখে এসে বক্তব্য দেন। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করাকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে আন্দোলন-সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে জনগণকে আহ্বান জানান। সেখানেই তিনি ২ মার্চ ঢাকায়, ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল পালনের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় চূড়ান্ত কর্মসুচী ঘোষণা করা হবে বলে জানায়।



২রা মার্চ ১৯৭১: ঢাকায় শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন, আওয়ামীলীগ পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা করে। ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। কারফিউ জারী হয় সন্ধা ৭ টা থেকে ভোর ৭টা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ হরতাল একে একে ৬ তারিখ পর্যন্ত পালন করল। সেই হরতালের জন্য কোনো পিকেটিং বা প্রচারণা করতে হয়নি, গাড়ি-রিকশা ভাঙচুর করতে বা পোড়াতে হয়নি। মানুষই স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালের পরিধি বাড়িয়ে দিল, মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে সবাই। পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে মানুষ রাস্তায় প্রতিদিন মিছিল করতে থাকে। মিছিলে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন নিহত হলেন, আহতও হলেন। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সহকর্মীরা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের উপায় খুঁজছিলেন। জনগণ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় সেই সময় ব্যাপকভাবে রাস্তায় নেমে আসতে থাকে কিন্তু মানুষকে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত না করে নেতার পক্ষে স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার পরিণতি জাতিকে হঠকারিতামূলক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত করতে পারে। তাই জনগণকে আরো প্রস্তুত করার অবস্থানে ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

৩রা মার্চ ১৯৭১: পাঞ্জাব পাকিস্থান ফ্রন্ট (পিপিএফ) ভুট্টোর ভূমিকার চরম নিন্দা করেন। তারা বাংলার জনগণের প্রতি অত্যাচার বন্ধের আহ্বান জানান।

৪ঠা মার্চ ১৯৭১: বঙ্গ বন্ধু সকল ব্যাংকে সরকারী এবং আধা সরকারী কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য নির্দেশ দেন। দুপুর ২.৩০ থেকে বিকাল ৪.৩০ পর্যন্ত শুধু মাত্র বেতন পরিশোধের জন্য ব্যাংক খোলা রাখতে বলেন এবং সর্বোচ্চ বেতন পরিশোধের সীমা নির্ধারণ করে দেন ১৫০০ টাকা।

৫ই মার্চ ১৯৭১: মার্শাল ল অথরিটি সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দেশব্যাপী আন্দোলন আরো জোরদার হতে থাকে।


৬ই মার্চ ১৯৭১ : সর্বাত্বক অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। দেখতে দেখতে এসে পরে ৬ই মার্চ। আন্দোলনরত জনগণকে সমর্থন জানাতে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা আন্দোলনে যোগ দেয়।


এছাড়াও এদিন, ৭ মার্চের প্রাক্কালে, ইয়াহিয়া খান ৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে পরিস্থিতি বাগে আনতে ১০ মার্চ ঢাকায় গোলটেবিল বৈঠক এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার ঘোষণা করেন। উদ্দেশ্য ছিল ৭ মার্চের জনসভাকে ম্লান করে দেওয়া। এবং তিনি লে. জে. টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের নতুন গভর্নর নিয়োগ দেন।

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ, বাংলাদেশের স্বপ্ন চূড়ান্ত করা সেই ভাষণ,

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ জনতার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং স্বাধীনতা লাভের প্রতি আকাঙ্ক্ষার স্লোগান স্পষ্টই বুঝিয়ে দিচ্ছিল বাংলাদেশের জনগণ আর পাকিস্তানে বসবাস করতে চায় না, জনগণ স্বাধীনতা চায়। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পথটি খুবই কঠিন ছিল, যা জানতেন ও বুঝতেন নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি রাষ্ট্র-রাজনীতিকে কত গভীর প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝতেন তা বোঝা গেল ১৮ মিনিটের ইতিহাস কাঁপানো মহান দীপ্ত ভাষণে। এই ভাষণ মুখস্থ বুলি আওড়ানো কিছু শব্দ নয়, প্রানের আবেগ আর রাজনৈতিক চূড়ান্ত প্রজ্ঞার সেই ভাষণ ছিল জাতির মুক্তির রুপরেখা। বঙ্গবন্ধু এক মহাকাব্য রচনা করে গেলেন। দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারন করে গেলেন বাঙালির হাজার বছরের চাওয়া-পাওয়া, দুঃখকষ্টের কথা।

সর্বকালের সেরা বাঙালির শ্রেষ্ঠ ভাষণটি কোট করছি,


“ভায়েরা আমার,আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সকলে জানেন এবং বোঝেন আমরা জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম?
নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরী করব এবং এদেশের ইতিহাসকে গড়ে তুলব। এদেশের মানুষ অর্থনীতিক, রাজনীতিক ও সাংষ্কৃতিক মুক্তি পাবেন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলছি বাংলাদেশের করুণ ইতিহাস, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। এই রক্তের ইতিহাস মুমূর্ষু মানুষের করুণ আর্তনাদ—এদেশের ইতিহাস, এদেশের মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।
১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি।১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খাঁ মার্শাল-ল জারি করে ১০ বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আয়ুব খাঁর পতনের পরে ইয়াহিয়া এলেন। ইয়াহিয়া খান সাহেব বললেন দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন— আমরা মেনে নিলাম। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আমাদের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দিন। তিনি আমার কথা রাখলেন না। রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে সভা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব— এমনকি এও পর্যন্ত বললাম, যদি ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজনের মতেও যদি তা ন্যায্য কথা হয়, আমরা মেনে নেব।
ভুট্টো সাহেব এখানে ঢাকায় এসেছিলেন আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, আলোচনার দরজা বন্ধ নয়, আরো আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করলাম— আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরী করব। সবাই আসুন, বসুন। আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরী করব। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলি। তিনি বললেন, যারা যাবে, তাদের মেরে ফেলে দেওয়া হবে। আর যদি কেউ এসেম্বলিতে আসে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত সব জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে। আর হঠাৎ মার্চের ১লা তারিখে এসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম, যাবো। ভুট্টো বললেন, যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষের, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। দেশের মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলো।
আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করুন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। আমি বললাম, আমরা জামা কেনার পয়সা দিয়ে অস্ত্র পেয়েছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য। আজ সেই অস্ত্র দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের বিরুদ্ধে— তার বুকের ওপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু— আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
আমি বলেছিলাম জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। দেখে যান কিভাবে আমার গরিবের ওপর, আমার বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে। কিভাবে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। কী করে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। আপনি আসুন, আপনি দেখুন। তিনি বললেন, আমি ১০ তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স ডাকব।
আমি বলেছি কীসের এসেম্বলি বসবে? কার সঙ্গে কথা বলব? আপনারা যারা আমার মানুষের রক্ত নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলব? পাঁচ ঘন্টা গোপন বৈঠকে সমস্ত দোষ তারা আমাদের বাংলার মানুষের ওপর দিয়েছেন, দায়ী আমরা।
২৫ তারিখে এসেম্বলি ডেকেছেন। রক্তের দাগ শুকায় নাই। ১০ তারিখে বলেছি, রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের ওপর পাড়া দিয়ে, এসেম্বলি খোলা চলবে না। সামরিক আইন মার্শাল-ল উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ঢুকতে হবে। যে ভাইদের হত্যা করা হয়েছে, তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখব আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারব কিনা। এর পূর্বে এসেম্বলিতে আমরা বসতে পারি না।
আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশ কোর্ট-কাচারি, আদালত, ফৌজদারি আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সেজন্য যে সমস্ত জিনিসগুলি আছে, সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি, রেল চলবে। শুধু সেক্রেটারিয়েট ও সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্ট, জজ কোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তর, ওয়াপদা— কোনো কিছুই চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেয়া না হয়, এরপর যদি একটি গুলি চলে, এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়— তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। সৈন্যরা, তোমরা আমাদের ভাই। তোমরা ব্যারাকে থাকো, তোমাদের কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আর তোমরা গুলি করবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।
আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগ থেকে যদ্দুর পারি সাহায্য করতে চেষ্টা করব। যারা পারেন আওয়ামী লীগ অফিসে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছে দেবেন। আর সাতদিন হরতালে শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেক শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে ততদিন ওয়াপদার ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো— কেউ দেবে না। শুনুন, মনে রাখুন। শত্রু পেছনে ঢুকেছে আমাদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান যারা আছে আমাদের ভাই— বাঙালি অবাঙালি তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের ওপর। আমাদের যেন বদনাম না হয়।
মনে রাখবেন, রেডিও যদি আমাদের কথা না শোনে, তাহলে কোনো বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবে না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, তাহলে কর্মচারীরা টেলিভিশনে যাবেন না। দুঘন্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্র নিতে পারে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বাংলাদেশের নিউজ বাইরে পাঠানো চলবে।
এই দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা চলছে— বাঙালিরা বুঝেসুঝে কাজ করবে। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলুন এবং আমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”




সম্পূর্ণ ভাষণের ভিডিওঃ


সেই রাতেই আওয়ামী লীগ ১০ দফার ভিত্তিতে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। টিক্কা খান ঢাকায় আসেন। বিভিন্ন স্থানে বাঙালি অবাঙালি সংঘর্ষ ও সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।



৭ই মার্চ হয়ে উঠল স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য অসাধারণ ঐতিহাসিক দিবস, মাইলফলক; যেখান থেকে পিছিয়ে আসা গোটা জাতির পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। সূচিত হলো পাকিস্তান সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি অসহযোগ আন্দোলন, পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করার সামগ্রিক মানসিকতা। কার্যত পূর্ববাংলা তখন বঙ্গবন্ধু তথা জনগণের পছন্দের নেতৃত্বের হাতেই চলে আসে। কিন্তু তার পরও সামরিক শক্তি, রাষ্ট্রযন্ত্র বলে একটি মহাদানবীয় ব্যাপার ছিল, ছিল আন্তর্জাতিক মহাশক্তিধর রাষ্ট্রব্যবস্থার অবস্থান।


৮ মার্চ ১৯৭১: পূর্ব পাকিস্থান ছাত্রলীগের নামকরণ শুধু ‘ছাত্রলীগ’ ঘোষণা করা হয় এবং স্বাধীণ বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

৯ই মার্চ ১৯৭১ : এইদিনে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পল্টন ময়দানে ভাষন দেন। “ইয়াহিয়া কে তাই বলি, অনেক হইয়াছে আর নয়। তিক্ততা বাড়াইয়া আর লাভ নেই। ‘লাকুম দিনুকুম আলিয়াদ্বীন’(তোমার ধর্ম তোমার আমার ধর্ম আমার) এর নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার স্বীকার করে নাও। শেখ মুজিবের নিদের্শমত আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে কোন কিছু করা না হলে আমি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মিলিত হইয়া ১৯৫২ সালের ন্যায় তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলবো।”
ভাষানী এদিন ১৪ দফা ঘোষণা করেন। বিভিন্ন আন্দোলন চলতে থাকে, প্রানহানীও থেমে থাকেনি।

১০ মার্চ ১৯৭১: সরকারী ও আধা সরকারী সংস্থার প্রতি আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে তাজউদ্দিন আহমেদ নির্দেশাবলী দেন।

১১ মার্চ ১৯৭১: ছাত্র ইউনিয়ন কতৃক স্বাধীণ পূর্ব বাংলা কায়েমের সংগ্রামের আহ্বান। জনগণের প্রতি ছাত্র ইউনিয়নের যে আহ্বান ছিলো:
- রাজনৈতিক প্রচার অব্যাহত রাখুন। গ্রাম অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে ইহা ছড়াইয়া দিন।
-সর্বত্র ‘সংগ্রাম কমিটি’ ও ‘গণবাহিনী’ গড়িয়া তুলুন।
- শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকুন।
- যে কোন রূপ দাঙ্গা-হাঙ্গামা-উষ্কানী প্রতিরোধ করুন।
- শান্তি-শৃঙ্খলা নিজ উদ্যোগে বজায় রাখুন।
- এই সংগ্রামের সফলতার জন্য সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রাম শক্তির একতা গঠনের জোর আওয়াজ তুলুন।

১৩ মার্চ ১৯৭১: আওয়ামীলীগের প্রতি জাতীয় পরিষদের সংখ্যালঘিষ্ট দল গুলো সমর্থন।

১৫ই মার্চ ১৯৭১ : শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকের উদ্দেশ্যে ইয়াহিয়া ঢাকায় আসে। কিন্তু একটি প্রেস কন্ফারেন্সে ভুট্টো ঘোষণা দেন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠন করবেন না’।
১৮ মার্চ: অসহযোগ আন্দোলন ১৬ দিনে পদার্পণ করে। এই আন্দোলনের ঢেউ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
২০ মার্চ: জয়দেবপুরের রাজবাড়ীতে অবস্থিত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়ন তাদের হাতিয়ার ছিনিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয়। গ্রামের পর গ্রাম থেকে মানুষ এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সবাই মিলে টঙ্গী-জয়দেবপুর মোড়ে ব্যারিকেড গড়ে তোলে নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য শামসুল হকের নেতৃত্বে।


২২ মার্চ ১৯৭১: শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত স্বাধীনতার জন্য বাঙালী সংগ্রামে গর্জে ওঠে। যতই দিন গড়াচ্ছিল, রাজনৈতিক সঙ্কট ততই গভীরতর হচ্ছিল। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে একাত্তরের ২২ মার্চের ঘটনাবলী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সকালে ২৫ মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে বলেন, পাকিস্তানের উভয় অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনাক্রমে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের পরিবেশ সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ২৫ মার্চের অধিবেশন স্থগিত রাখা হয়েছে।

অসহযোগ আন্দোলনের ২১তম দিবস ছিল ২২ মার্চ। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগাণে মুখরিত হাজার হাজার মানুষ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দিকে ছুটে যায়। সমবেত জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বেশ কয়েকবার বক্তৃতা করেন। সংগ্রামী জনতার ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানের মধ্যে স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন বন্দুক, কামান, মেশিনগান কোন কিছুই জনগণের স্বাধীনতা রোধ করতে পারবে না।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রাতে ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে প্রদত্ত এক বাণীতে বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মিলেমিশে এক সঙ্গে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তান এখন এক ক্রান্তিলগ্নে উপনীত। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পথে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে। তবে আমরা যদি আমাদের লক্ষ্যে অবিচল থাকি, তাহলে কোনকিছুই আমরা হারাব না।

২৩শে মার্চ ১৯৭১ : পাকিস্তানের জাতীয় দিবস আওয়ামী লীগ প্রতিরোধ দিবস হিসাবে পালন করেন। ফলাফলবিহীন আলোচনা চলতে থাকে। সর্বত্র বাংলাদেশের নতুন জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়।

২৫শে মার্চ ১৯৭১: আলোচনা ভেঙে যায়। ইয়াহিয়া ও ভূট্টো গোপনে পাকিস্তান চলে যায় এবং শেখ মুজিবকে বন্দি করে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়।

মুজিবকে সে রাতে তার গ্রেপ্তার কে করেছিলো, কিভাবে করেছিলো? পাকিস্তানী তরফ এ ঘটনার নায়ক ব্রিগেডিয়ার (অব.) জহির আলম খান। সে সময় মেজর পদবীধারী এই স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (অফিসার) পাকিস্তানী সামরিক অফিসারদের ঐতিহ্য ধরে রেখে একটা বই লিখেছেন ‘দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ’ নামে। চলুন শুনি তার সেই বীরত্বের কাহিনী। শিরোনামে "বিগ বার্ড" শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কারণ অপারেশন সার্চলাইটে মুজিবের কোডনেম ছিলো এটি। মুজিবকে অপহরনে কৃত পরিকল্পনা ও তার কর্মপন্থার সার্বিক বর্ণনা পাবেন এখানে।



এরপর আসে ইতিহাসের ভয়ালতম কালো রাত্রি। বাঙালির ইতিহাসে সবথেকে আতংকের রাত। যাবার আগে সামরিক সরকার গণ হত্যার নির্দেশ দিয়ে যায়। ইতোমধ্যে ব্যাপক পাকিস্তানি সৈন্যের সমাগম ঘটে। অপারেশন সার্চ লাইটের নামে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হয় এই রাতেই। ২৫ শে মার্চ কালোরাত ও অপারেশন সার্চলাইট অপারেশনে নেমেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, নির্বিচার হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও স্বাধীনতাকামী বাঙালীর কণ্ঠ বুলেট দিয়ে চিরতরে স্তব্ধ করার আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিলো ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, বর্তমানে বিজিবি) ও পুলিশসহ বাঙালী সেনা সদস্যদের নিরস্ত্র করা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানসহ আওয়ামীলীগ এর নেতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ১৬ জন ব্যক্তির বাসায় হানা দিয়ে তাদের গ্রেফতার। জ্বলছে ঢাকা, মরছে বাঙালী। একইসঙ্গে শুরু হয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার প্রথম প্রহর।


২৫ মার্চ পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী প্রতিশ্রুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের পরিবর্তে কামান, ট্যাংক, গোলাবারুদ নিয়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।


ঢাকার এই অপারেশনে বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলো :
১৩ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স : ঢাকা সেনানিবাস আক্রান্ত হলে সেটা সামাল দিতে রিজার্ভ হিসেবে রাখা হয়েছিলো তাদের।




৪৩ লাইট অ্যান্টি এয়ারক্রাফট রেজিমেন্ট : তেজগাঁ বিমানবন্দরের দায়িত্বে
২২ বেলুচ : পিলখানায় ইপিআরদের নিরস্ত্রিকরণ ও তাদের ওয়ারলেস এক্সচেঞ্জ দখলের দায়িত্বে।
৩২ পাঞ্জাব : রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দায়িত্বে
১৮ পাঞ্জাব : নবাবপুরসহ পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোর দায়িত্বে
১৮ পাঞ্জাব, ২২ বেলুচ ও ৩২ পাঞ্জাবের একটি করে কোম্পানির সমন্বয়ে যৌথ ইউনিট ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিল

স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ একদল কমান্ডোর দায়িত্ব ছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে জীবিত গ্রেপ্তার করা। এক স্কোয়াড্রন এম-২৪ ট্যাঙ্ক ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় ছিলো।



উল্লেখ্য, রাও ফরমান আলীর তত্বাবধানে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবের নেতৃত্বাধীন ৫৭ ব্রিগেড ঢাকা ও আশপাশে অপারেশন চালায়, মেজর জেনারেল খাদিম রাজা।


পৃথিবীর জঘন্যতম এই গণহত্যা "অপারেশন সার্চলাইটের" যেন কোন সাক্ষী না থাকে সেজন্য বিদেশী সাংবাদিকদের ২৬ মার্চ সকালে ঢাকা থেকে বের করে দেয়া হয়। সাংবাদিকদের সকল আলোকচিত্র, প্রতিবেদন ও নোট বই আটক করে একটি বিমানে তুলে দেয়া হয়। তারপরও সাইমন ড্রীং নামে এক সাংবাদিক ঢাকায় লুকিয়ে থেকে গোপনে ছবি ও প্রতিবেদন বিদেশে প্রেরণ করলে ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর মানুষ এই গণহত্যার সর্ম্পকে জানতে পারে। হৈ চৈ পরে যায় বিশ্বব্যাপী। কিন্তু পাকিস্তান সামরিক জান্তার অপর্কম আড়াল করার জন্য দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকাবলে; এগুলো কোন গণহত্যার ছবি নয়,’ ৭০ এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের যে অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল এগুলো তারই ছবি। পাকিস্তানিরা যে আমাদের বাঙালিত্ব নষ্ট করতে চেয়েছিল তার প্রমাণ; লেঃ জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী’র উক্তিতেই-

“ম্যায় ইস হারামজাদী কওম কি নাসল বদল দুঙ্গা (আমি এই জারজ জাতির বংশগতি বদলে দেব)। ”


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাযজ্ঞের ভিডিওফুটেজ।





মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তারা কামান-ট্যাংকের নিচে গুঁড়িয়ে দেবার চেষ্টা শুরু করে। শাসকদল ধারণা করেছিল, বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু হলো ঠিক উল্টোটি, বাঙালির প্রত্যাশিত স্বাধীনতার যাত্রাই শুরু হলো, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাকিস্তানী শাসনের চিরবিদায়ের ঘোষণা বেজে উঠল।



চরম সকটাপন্ন অবস্থায়দেশ, যুদ্ধ চলছে, চলছে লাশের মিছিল। প্রয়োজন ছিল সামরিক সমর্থন সহ একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, যা দেশ ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার দরকার ছিল। তখন আবারও, আনুষ্ঠানিক ভাবে, ২৭ শে মার্চে চট্টগ্রামের কালুঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দৃপ্ত ঘোষণা পাঠ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। এ ঘোষণা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং বিদেশেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং পূর্ণ উদ্যোমে জনগন স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।



শেখ মুজিবুর রহমান এর পক্ষে জিয়ার পাঠকৃত ঘোষণা,


# আপাত দৃষ্টিতে শহীদ প্রেসিডেন্ট মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক/পাঠক যাই বলা হোক, এর পেছনের ইতিহাস ও ঘোষণা কি করে এলো তা জানতে হলে জেনে নিতে হবে ২৫শে মার্চ রাতে এবং ২৬ তারিখে আসলে কি ঘটেছিল।

# স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে জল ঘোলা অনেক হয়েছে, ব্যাক্তিগত বা দলীয় ফায়দার জন্যে যা করা হয়েছে বা হচ্ছে। যেখানে প্রথম ঘোষক এবং স্বাধীনতার ডাক দিয়ে শেষ সময় পর্যন্ত ভুমিকা রাখা মানুষগুলোর ত্যাগ কে স্রেফ আড়াল করে দেয়া হয়েছে। সে সব এড়িয়ে সত্য অনুসন্ধানে সেই সময়ের সার্বিক পরিস্থিতি সহ ফ্যাক্ট জেনে নিন এই রিপোর্টে।

উইকিপিডিয়া অনুসারে, স্বাধীনতার ঘোষণা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। কথিত আছে, গ্রেপ্তার হবার একটু আগে ২৫শে মার্চ রাত ১২টার পর (অর্থাৎ, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে) তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন যা চট্টগ্রামে অবস্থিত তত্কালীন ই.পি.আর এর ট্রান্সমিটারে করে প্রচার করার জন্য পাঠানো হয়। ঘোষণাটি নিম্নরুপ:
অনুবাদ: “এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উত্খাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।”
২৬শে মার্চ বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সহ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েক'জন কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ.হান্নান প্রথম শেখ মুজিব এর স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি মাইকিং করে প্রচার করেন। পরে ২৭শে মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ঘোষণাপত্রটির ভাষ্য নিম্নরুপ:
অনুবাদ: আমি,মেজর জিয়া, বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির প্রাদেশিক কমাণ্ডার-ইন-চিফ, শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আমি আরো ঘোষণা করছি যে, আমরা শেখ মুজিবর রহমানের অধীনে একটি সার্বভৌম ও আইনসিদ্ধ সরকার গঠন করেছি যা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক


Share with :

Facebook Twitter